প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং এর কারণসমূহ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং এর কারণসমূহ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং এর কারণসমূহ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারত ও ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী সম্পর্কের মধ্যে একটি সন্ধিক্ষণ বলে প্রমাণিত হয়েছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চৌদ্দ লক্ষ ভারতীয় এবং ব্রিটিশ সৈন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের এই অংশগ্রহণ একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারণ বলে গণ্য হয়। ভারতীয় সৈন্যদের ব্রিটিশ এবং অন্যান্য অধিরাজ্য যেমন কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং মৃত্যুর খবর পৃথিবীর দূরতম কোনে ছড়িয়ে পড়েছিল খবরের কাগজ এবং নতুন মাধ্যম রেডিওর মাধ্যমে।

 

[৮] এর ফলে ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান উন্নত হয়েছিল এবং ১৯২০-এর দশক ধরে তা উন্নত হতে থাকে।[৮] এর ফলে আরও কিছু বিষয়ের সাথে ভারত নিজের নামেই ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে 'লিগ অফ দ্য নেশনস' এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয় এবং ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের অ্যান্টওয়ার্পের গ্রীষ্ম অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় 'লেস ইনডেস অ্যাংলাইসেস' (দি ব্রিটিশ ইন্ডিস) নামে অংশগ্রহণ করে।[৯] এর ফলে ভারতে মূলত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের আরও বেশি ভারতীয় আত্মশাসনের অধিকার সম্পর্কে দাবি জানাতে দেখা যায়।[৮]


১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌ চুক্তি স্বাক্ষর এবং হোম রুল লিগস স্থাপনার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদীদের শক্তি প্রদর্শিত হয়। একই সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মেসোপটেমিয়া অভিযানের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এই বিষয়টিও উপলব্ধিত হয় যে যুদ্ধ আরও বেশি সময়ের জন্য চলতে পারে। নতুন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ড সতর্ক করেন যে ভারত সরকারের উচিত ভারতীয়দের দাবিগুলির প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়া।

 

[১০] এই বছরের শেষের দিকে লন্ডনে সরকারের সাথে আলোচনা করার পরে লর্ড চেমসফোর্ড প্রস্তাব দেন যে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের যুদ্ধে ভূমিকার কথা খেয়াল রেখে তাদের উপর নিজেদের বিশ্বাস প্রদর্শনের বিবিধ কর্মসূচি নেবে। তার মধ্যে ছিলে ভারতীয় রাজাদের পুরস্কার, উপাধি এবং সম্মান দান, ভারতীয়দের সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন পদ প্রদান এবং অপ্রয়োজনীয় তূলা আবগারি শুল্কের অপসারন। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ব্রিটেন কর্তৃক ভারতের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ঘোষণা এবং কিছু দৃঢ় পদক্ষেপের ঈঙ্গিত।

 

[১০] আগস্ট ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে আলোচনার পরে ভারতের নতুন উদারপন্থী রাষ্ট্র সচিব এডউইন মন্টেগু ঘোষণা করেন ব্রিটিশ লক্ষ্য হল "প্রশাসনের প্রতিটি শাখায় ভারতীয়দের আরও বেশি অংশগ্রহন এবং স্বশাসিত সংস্থাগুলির ক্রমোন্নতির মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে ভারতে উন্নতিশীল দায়িত্ববান সরকারের গঠন"।[১০] এটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল শিক্ষিত ভারতীয়দের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে, যাদের অবজ্ঞা করা হত প্রতিনিধিহীন সংখ্যালঘু হিসাবে। 

 

যাদের মন্টেগু বর্ণনা করেছিলেন "বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে আমাদের সন্তান" হিসাবে।[১১] সংস্কারের গতি কোথায় এবং কখন বাড়ানো হবে তা ব্রিটেন স্থির করত যখন ভারতীয়দের তা অর্জন করতে দেখা যেত।[১১] যদিও এই পরিকল্পনাটি প্রথমে ভাবা হয়েছিল কেবল রাজ্যগুলিতে সীমিত স্বশাসনের কথা ভেবেই - ভারতে অথচ দৃঢ়ভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতরে। এটি একটি অশ্বেতাঙ্গ উপনিবেশে যে কোন রকম প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের প্রথম ব্রিটিশ প্রস্তাবের প্রতিনিধিত্ব করেছিল।


এর আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ইউরোপ এবং মেসোপটেমিয়ায় ভারতের বেশিরভাগ ব্রিটিশ সেনার পুর্ননিয়োগের ফলে পূর্ববর্তী জয় এসেছিল। লর্ড হার্ডিং এর ফলে "ভারত থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি" সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

[৮] বিপ্লবী সহিংসতা ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ ভারতে একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। ফলস্বরূপ ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে বর্দ্ধিত দুর্বলতার সময় নিজের ক্ষমতা আরও জোরদার করার জন্য ভারত সরকার ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া আইন জারি করে। যা সরকারকে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক বিরোধীদের বন্দী করার ক্ষমতা দেয় এবং ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের প্রেস আইন অনুযায়ী যা ক্ষমতা ছিল তাকে আরও জোরালো করা হয়। যার মধ্যে ছিল সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা এবং সংবাদমাধ্যমকে সেন্সর করা।

 

[১২] এখন সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়টি আন্তরিকভাবে আলোচনা করা শুরু হয়। ব্রিটিশ সরকার বিবেচনা করতে শুরু করে কিভাবে নরমপন্থী ভারতীয়দের সাংবিধানিক রাজনীতির মধ্যে আনা যায় এবং একই সাথে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিকদের হাত শক্তিশালী করা যায়।[১২] যদিও সংস্কার পরিকল্পনাটি এমন একটি সময়ে নেওয়া হয়েছিল যখন চরমপন্থী সহিংসতা যুদ্ধকালীন সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে হ্রাস পেয়েছিল। 

 

এখন বিপ্লবী সহিংসতা পুনরুজ্জীবনের আশঙ্কায়[১১] সরকার বিবেচনা করতে লাগল কিভাবে যুদ্ধকালীন ক্ষমতাগুলি শান্তির সময়েও টিঁকিয়ে রাখা যেতে পারে।[১২][১২]
ভারতের রাষ্ট্র সচিব এডউইন মন্টাগু, বামদিকে, যাঁর দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯১৯ সালের ভারত সরকার আইন চালু হয়। এটিকে মন্টফোর্ড সংস্কার বা মন্টাগু-চেমসফোর্ড সংস্কার বলেও অভিহিত করা হয়।


সুতরাং ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে যদিও এডউইন মন্টাগু নতুন সাংবিধানিক সংস্কারের ঘোষণা করেছিলেন, একটি রাষ্ট্রদ্রোহ বিষয়ক পরিষদকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতে যুদ্ধকালীন সময়ে বিপ্লবী ষড়যন্ত্র এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপের সাথে জার্মান এবং বলশেভিক যোগাযোগ তদন্ত করে দেখতে।

 

[১৩][১৪][১৫] এই পরিষদের সভাপতি ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিচারপতি মিস্টার এস. এ. টি. রাওলাট। এই পরিষদের অলিখিত লক্ষ্য ছিল সরকারের যুদ্ধকালীন ক্ষমতাগুলিকে পরবর্তী সময়ে বাড়িয়ে নেওয়া।[১০] রাওলাট পরিষদ তার বিবৃতি পেশ করে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে এবং ষড়যন্ত্রমূলক বিদ্রোহের তিনটি অঞ্চল চিহ্নিত করে: বাংলা, বম্বে প্রেসিডেন্সি এবং পাঞ্জাব।

 

[১০] এই অঞ্চলগুলিতে বিধ্বংসী কার্যকলাপের মোকাবিলা করার জন্য রাওলাট পরিষদ সুপারিশ করে যে সরকার তার জরুরি ক্ষমতাগুলিকে যুদ্ধকালীন সময়ের মত ব্যবহার করবে। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাগুলির জুরি ছাড়া তিনজন বিচারপতির প্যানেলের মাধ্যমে বিচারের ক্ষমতা, সন্দেহভাজনদের থেকে বলপূর্বক জমানত আদায়, সরকার কর্তৃক সন্দেহভাজনদের বাসস্থানের উপর নজরদারী[১০] এবং প্রাদেশিক সরকারগুলির জন্য সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে স্বল্পমেয়াদী কারাগারে আটক রাখার ক্ষমতা।[১৬]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ হওয়ার সাথে অর্থনৈতিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ১৫ লক্ষ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে ছিল সামরিক এবং অসামরিক ভূমিকায়। ভারত যুদ্ধের জন্য রাজস্ব হিসাবে ১৪ কোটি ৬০ লক্ষ পাউন্ড দিয়েছিল।[১৭] বর্ধিত কর এবং অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্নের ফলে ভারতে ১৯১৪ থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সামগ্রিক মূল্য সূচক দ্বিগুন হয়ে যায়।[১৭] যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈনিকরা মূলত পাঞ্জাবে বর্ধনশীল বেকারত্ব সংকট তৈরি করে।

 

[১৮] যুদ্ধ পরবর্তী মূল্যবৃদ্ধি বম্বে, মাদ্রাজ এবং বাংলার প্রদেশগুলিতে খাদ্য দাঙ্গার কারণ হয়।[১৮] ১৯১৮-১৯ খ্রিষ্টাব্দের খারাপ বর্ষা, অবৈধ মুনাফা এবং ফাটকা এই পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছিল।[১৭] পৃথিবীব্যাপি ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী এবং ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বলশেভিক বিপ্লব ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রথম কারণটি জনসাধারনের মধ্যে অর্থনৈতিক দুর্দশা সৃষ্টি করেছিল[১৮] এবং দ্বিতীয়টি সরকারী কর্মকর্তাদের ভীত করে তুলেছিল এই ভয়ে যে ভারতেও এইরকম বিপ্লব ঘটতে পারে।[১৯]

আসন্ন সঙ্কটের সাথে মোকাবিলা করার জন্য,সরকার রাওলাট পরিষদের সুপারিশগুলিকে দুটি রাওলাটের বিলের মাধ্যমে সাজায়।[১৬] যদিও বিলগুলি এডউইন মন্টাগু কর্তৃক আইনি বিবেচনার জন্য অনুমোদিত ছিল, কিন্তু এগুলি করা হয়েছিল অনিচ্ছার সাথে। এর সাথে ঘোষণা করা হয়েছিল, "আমি প্রথম দৃষ্টিতেই ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া আইনকে শান্তির সময়ে চালু রাখার এই পরামর্শকে ঘৃণা করি সেই অবধি, যতটা রাওলাট এবং তাঁর বন্ধুরা এটিকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন।"

 

[১০] ইম্পেরিয়াল আইনি পরিষদে আসন্ন আলোচনা এবং নির্বাচনে সব ভারতীয় সদস্যরাই এই বিলগুলির বিপক্ষে সরব হন। তবুও ১৯১৯ সালের গোড়ার দিকে বিলটি পাস করার জন্য ভারত সরকার তার "সরকারী সংখ্যাগরিষ্ঠতা" ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল।[১০] যাইহোক যখন বিলটি পাস হয় তখন ভারতীয় বিরোধীদের সম্মান দিয়ে বিলটির একটি ক্ষুদ্রতর সংস্করন করা হয়েছিল।

 

এটি এখন অতিরিক্ত বিচারবিভাগীয় ক্ষমতাকে অনুমোদন করে কিন্তু ঠিক তিন বছরের জন্য এবং কেবল "নৈরাজ্যবাদী এবং বিপ্লবী আন্দোলনের" বিচার করার জন্য। ভারতীয় দণ্ডবিধির পরিবর্তনের সাথে জড়িত দ্বিতীয় বিলটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়।[১০] তবুও, যখন নতুন রাওলাট বিল পাস হয় তখন সমগ্র ভারত জুড়ে ব্যাপক রোষ সৃষ্টি হয়েছিল এবং মোহনদাস গান্ধীকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।[১৬]
মন্টাগু চেমসফোর্ড রিপোর্ট ১৯১৯

এরমধ্যে, মন্টাগু এবং চেমসফোর্ড নিজেরাই অবশেষে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে তাদের প্রতিবেদনটি পেশ করেন। তারা এর আগের শীতে একটি দীর্ঘ ভারত সফর করেছিলেন প্রকৃত বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য।[২০] ভবিষ্যতের নির্বাচনে ভারতীয় জনগণের মধ্যে কে ভোট দিতে পারবে তা চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটেনের সরকার ও সংসদ দ্বারা আরও আলোচনার পর এবং ভোটাধিকার ও কার্যাবলী পরিষদের আরও একটি সফরের পর, দি গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া আইন ১৯১৯ (যেটি মন্টাগু-চেমসফোর্ড সংস্কার নামেও পরিচিত) পাস করা হয় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে।

 

[২০] নতুন আইনটি প্রাদেশিক পরিষদগুলিকে আকারে বড় করে এবং ইম্পেরিয়াল আইনি পরিষদ কে আরও বড় কেন্দ্রীয় আইনিসভাতে পরিণত করে। এটি ভারত সরকারের প্রতিকূল ভোটেও "সরকারী সংখ্যাগরিষ্ঠতার" সুবিধাটি বাতিল করে দেয়।[২০] যদিও প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয়, ফৌজদারি আইন, যোগাযোগ এবং আয়কর প্রভৃতি বিভাগগুলি নতুন দিল্লিতে ভাইসরয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ছিল, অন্যান্য বিভাগ যেমন জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি-রাজস্ব এবং স্থানীয় স্বশাসিত সরকারগুলি প্রদেশগুলিতে স্থানান্তরিত হয়।

 

[২০] এখন থেকে প্রদেশগুলিকে নিজেদের একটি নতুন দ্বৈত শাসনব্যবস্থার (dyarchical system) অধীনে পরিচালনা করা হবে, যার ফলে শিক্ষা, কৃষি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় স্বশাসনের মত কিছু বিভাগ ভারতীয় মন্ত্রীদের এবং আইনসভার অধীনে আনা হয় যা পরিশেষে ভারতীয় নির্বাচকমণ্ডলীর অধীনে যায়। অন্যান্য বিভাগ যেমন সেচ, জমি-রাজস্ব, পুলিশ, কারাগার এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ গভর্নর এবং তার নির্বাহী পরিষদের কর্মক্ষেত্রের আওতায় রয়ে যায়।

 

[২০] এছাড়াও নতুন আইনটি ভারতীয়দের সিভিল সার্ভিসে এবং সেনা কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগের পথ সুগম করে। বড় সংখ্যায় ভারতীয়রা এখন ভোটাধিকার লাভ করে। যদিও জাতীয় পর্যায়ে ভোট দেওয়ার জন্য তারা মোট প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ ছিল এবং যাদের অনেকে তখনও অবধি অশিক্ষিত ছিল।

 

[২০] প্রাদেশিক আইনসভায়, ব্রিটিশরা কিছু পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে থাকে কয়েকটি বিশেষ আগ্রহের আসনকে আলাদা করে রাখার মাধ্যমে যেগুলিকে তারা মনে করত সহযোগী এবং দরকারী। বিশেষ করে গ্রামীণ প্রার্থীরা যারা সাধারণত ব্রিটিশ শাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং কম বিরোধী ছিল, তাদের শহুরে প্রতিপক্ষের তুলনায় আরও বেশি আসন প্রদান করা হয়।

 

[২০] অব্রাহ্মণ, জমির মালিক, ব্যবসায়ী ও কলেজ স্নাতকদের জন্য আসন সংরক্ষিত করা হয়। "সাম্প্রদায়িক সংরক্ষণের" নীতি ছিল মিন্টো-মোরলি সংস্কারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আরও পরে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ লখনউ চুক্তিটি পুনরায় চালু করা হয়, মুসলমান, শিখ, ভারতীয় খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানস এবং স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ইউরোপীয়ানদের জন্য প্রাদেশিক এবং ইম্পেরিয়াল আইনি পরিষদের আসন সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে।

 

[২০] মন্টাগু-চেমসফোর্ড সংস্কারগুলি বিশেষভাবে প্রাদেশিক স্তরে আইনি ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ভারতীয়দের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তবে, এই সুযোগটি তখনও সীমাবদ্ধ ছিল কারণ যোগ্য নির্বাচকদের সংখ্যা ছিল সীমিত, প্রাদেশিক পরিষদের জন্য কম বাজেট বরাদ্দ ছিল এবং গ্রামীণ এবং বিশেষ আগ্রহের আসনগুলি যেগুলি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছিল সেগুলির দ্বারা।

 

[২০] লন্ডনে অক্টোবর ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডকে গান্ধীর ডানদিকে দেখা যাচ্ছে
গোল টেবিল বৈঠক ১৯৩০-৩১-৩২

১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তিন পর্যায়ে গোল টেবিল বৈঠকগুলি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলি পরিচালিত হয়েছিল মুসলমান নেতা মহম্মদ আলি জিন্না কর্তৃক ভাইসরয় লর্ড আরউইন এবং প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ডের কাছে সুপারিশ অনুযায়ী[২১]

 

[২২] এবং ১৯৩০ সালের মে মাসে সাইমন কমিশনের প্রতিবেদন পেশ করার মাধ্যমে। ভারতে স্বরাজ বা আত্মশাসনের দাবি ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী হয়ে বেড়ে উঠছিল। ১৯৩০-এর দশকে অনেক ব্রিটিশ রাজনীতিক বিশ্বাস করতেন যে ভারতকে অধিরাজ্য বা ডমিনিয়ন অবস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। যাই হোক, ভারতীয় ও ব্রিটিশ নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতবিরোধ ছিল যেগুলি গোল টেবিল বৈঠকগুলি সমাধান করতে পারেনি।

 

[২৩] ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের একটি কার্টুন যেখানে ভিসকাউন্ট উইলিংডন কে গান্ধীর বিপক্ষে অনশন ধর্মঘট করতে দেখা যাচ্ছে।
ভাইসরয় লর্ড উইলিংডন দ্বারা কংগ্রেস নেতাদের কারাবন্দী

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে তিনটি গোলটেবিল বৈঠকের ব্যর্থতার পরে ভাইসরয় লর্ড উইলিংডন মোহনদাস গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের কার্যক্রমের মুখোমুখি হলেন। ভারত অফিস উইলিংডনকে জানায় যে তার কেবল ভারতীয় মতামতের সেই বিষয়গুলিকেই সন্তুষ্টি করা উচিত যেগুলি ব্রিটিশ রাজের সাথে সহযোগিতা করার জন্য ইচ্ছুক। এগুলির মধ্যে গান্ধী এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেস অন্তর্গত ছিল না। 

 

কংগ্রেস ৪ জানুয়ারি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। অতএব উইলিংডন সিদ্ধান্ত নেন[২৪] এবং মোহনদাস গান্ধীকে কারাবন্দী করেন। তিনি কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ করেন। তিনি কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটি এবং প্রাদেশিক কমিটির সকল সদস্যকে গ্রেফতার করে কারাবন্দী করেন এবং তিনি কংগ্রেসের যুব সংগঠন নিষিদ্ধ করেন। সব মিলিয়ে তিনি ৮০,০০০ ভারতীয় আইন অমান্য অংশগ্রহণকারীকে কারাবন্দী করেন। কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতাদের ছাড়া, প্রতিবাদ অসম এবং বিশৃঙ্খল ছিল, বয়কটগুলি ব্যর্থ ছিল। 

 

বেআইনি যুব সংগঠনগুলি বৃদ্ধি পেলেও অকার্যকর ছিল। মহিলারা আরও বেশি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। সন্ত্রাসমূলক কাজকর্ম বৃদ্ধি পায় বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রদেশে। মোহনদাস গান্ধী ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জেলেই থাকেন।[২৫][২৬] উইলিংডন তার ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য তার সামরিক সচিব হেস্টিংস ইসমের উপর নির্ভর করেন।[২৭]
সাম্প্রদায়িক পুরস্কার: ১৯৩২

ম্যাকডোনাল্ড চেষ্টা করেন ভারতীয়দের কিভাবে প্রতিনিধিত্ব করা হবে এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটির সমাধান করতে। ৪ আগস্ট ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমান, শিখ এবং ভারতীয় ইউরোপিয়ানদের আলাদা নির্বাচন ব্যবস্থা দেওয়া হয় এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানস এবং ভারতীয় খ্রিস্টানদের জন্য আলাদা নির্বাচন ব্যবস্থা বেশি সংখ্যক প্রদেশে মঞ্জুর করা হয়। 

 

অস্পৃশ্যরা (যাদের এখন দলিত বলা হয়) একটি আলাদা নির্বাচন ব্যবস্থা লাভ করে। এটি গান্ধীকে ক্ষুব্ধ করে কেননা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তাদের হিন্দু বলে গণ্য করা দরকার। গান্ধী এবং কংগ্রেস এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু যেভাবেই হোক এটি কার্যকর হয়।[২৭]
ভারত সরকার আইন (১৯৩৫)

১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে গোলটেবিল বৈঠকের ব্যর্থতার পরে ব্রিটিশ সংসদ ভারত সরকার আইন ১৯৩৫ অনুমোদন করে, যা ব্রিটিশ ভারতে সমস্ত প্রদেশে স্বাধীন আইন পরিষদ স্থাপন অনুমোদন করে, একটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করে যার মধ্যে ব্রিটিশ প্রদেশ এবং দেশীয় রাজ্যগুলি থাকবে এবং মুসলমান সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

 

[৩] স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যত সংবিধান এই আইন থেকে অনেকটাই ধার নিয়েছিল।[২৮] এই আইনটির মাধ্যমে একটি দুই কক্ষ বিশিষ্ট জাতীয় সংসদ এবং একটি কার্যনির্বাহী শাখা গঠন করা হয় যা ব্রিটিশ সরকারের আওতায় থাকবে। যদিও জাতীয় সঙ্ঘ কখনই তৈরি হয়নি, প্রাদেশিক পরিষদগুলির জন্য দেশব্যাপী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। প্রাথমিকভাব দ্বিধায় থাকা সত্ত্বেও, কংগ্রেস নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং ব্রিটিশ ভারতের এগারোটি প্রদেশের সাতটি প্রদেশে জয়লাভ করে।

 

[২৯] এবং এই প্রদেশগুলিতে যথেষ্ট শক্তির সাথে কংগ্রেস সরকার গঠন করে। গ্রেট ব্রিটেনে, এই জয়গুলি পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতার ধারণাটির পক্ষে জোয়ার আনে।[২৯]
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
তথ্য অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা !

Please Don’t sent Any Spam Link

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post